13. দ্বৈত ইঞ্জিন: পরিবর্তনের ছন্দ
"আমরা সেই নাবিকদের মতো, যাদের খোলা সমুদ্রেই নিজেদের জাহাজ নতুন করে গড়তে হয়, কখনো তা শুকনো ডকে খুলে সেরা উপকরণ দিয়ে সেখানে আবার নির্মাণ করার সুযোগ মেলে না।" — অটো নয়রাথ
লাল রানির দৌড়
লুইস ক্যারলের থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস (Through the Looking Glass)-এ অ্যালিস নিজেকে আবিষ্কার করে এক অদ্ভুত দেশে, যেখানে একই জায়গায় থাকার জন্যই তাকে যত জোরে পারে দৌড়াতে হয়। লাল রানি তাকে বলেন, "যদি অন্য কোথাও পৌঁছাতে চাও, তাহলে অন্তত এর দ্বিগুণ জোরে দৌড়াতে হবে!"
১৯৭৩ সালে জীববিজ্ঞানী লে ভ্যান ভ্যালেন উপলব্ধি করলেন, এটা কোনো খেয়ালি কল্পকাহিনি নয়। এটা বিবর্তনের এযাবৎ লেখা সবচেয়ে নির্ভুল বর্ণনা। তিনি দেখলেন, কোনো প্রজাতি কখনো সত্যিকার অর্থে "জেতে" না। শিকারির প্রতিটি বিবর্তনীয় অগ্রগতির জবাব আসে শিকারের পাল্টা অগ্রগতিতে। এটা এমন এক শেষরেখার দিকে অন্তহীন, দমবন্ধ দৌড়, যা সবসময় পিছিয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতি এক লাল রানির দৌড়। কোম্পানিগুলো বর্তমান বাজারের জন্য তাদের কৌশল অপ্টিমাইজ করে, অথচ বাজার নিজেই তাদের কৌশলের প্রতিক্রিয়ায় বদলে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রকেরা নিয়ম লেখেন গত সংকটের জন্য, অথচ বাজার তখন পরের সংকটটি উদ্ভাবনে ব্যস্ত। ধ্রুপদি অর্থনীতি, তার স্থির, ভারসাম্যনির্ভর মডেল নিয়ে, এই বাস্তবতার প্রতি অন্ধ। সে আমাদের দেয় এমন এক ব্যবস্থার আলোকচিত্র, যা বাস্তবে একটি চলচ্চিত্র।
পরিবর্তন বুঝতে হলে আমাদের দরকার এমন এক মডেল, যা বিবর্তনের দুই ভিন্ন সময়-মাপকে ধরতে পারে: খেলোয়াড়দের দ্রুত, উন্মত্ত দৌড়, আর খোদ খেলাটির ধীর, ভূত্বকীয় সরণ। এটাই দ্বৈত ইঞ্জিন (Dual Engine)।
ইতিহাসের ইঞ্জিনঘর
অর্থনীতি একটি ব্যবস্থা নয়, দুটি, এক চিরস্থায়ী, সৃজনশীল প্রতিক্রিয়া-চক্রে পরস্পর যুক্ত। এরা চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন গতিতে, আর এই সময়গত অমিলই সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, সমস্ত বাজার-ধস, আর সমস্ত মানব-প্রগতির উৎস।
দ্রুত ইঞ্জিন: বাজারের খেলা
এটা দৃশ্যমান অর্থনীতি, যেটা শিরোনাম থেকে চিৎকার করে। দাম সমন্বিত হচ্ছে। লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে। কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতা করছে। এটা কৌশলগত চালের জগৎ, ত্রৈমাসিক আয়ের জগৎ, বর্তমান পরিবেশে একটু এগিয়ে থাকার উপায় খোঁজার জগৎ। এটা চলে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতিতে, যা এখন আলোর গতিতে ত্বরান্বিত। এর সময়-মাপ কয়েক মিনিট থেকে কয়েক মাস। এটাই দৌড়।
ধীর ইঞ্জিন: খেলার বিবর্তন
এটা অদৃশ্য অর্থনীতি, যেটা ইতিহাসকে আকার দেয়। রীতিনীতি বদলাচ্ছে। বিশ্বাস বিবর্তিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো খাপ খাওয়াচ্ছে। প্রযুক্তি পরিণত হচ্ছে। এটা দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশলের জগৎ, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জগৎ, দৌড় পরিচালনাকারী নিয়মগুলো নতুন করে লেখার জগৎ। এটা চলে সামাজিক শিক্ষার গতিতে। এর সময়-মাপ কয়েক বছর থেকে কয়েক দশক। এটাই নির্ধারণ করে দীর্ঘমেয়াদে কে জিতবে।
ইঞ্জিন দুটি আলাদা নয়। এরা মৌলিকভাবে পরস্পর যুক্ত। দ্রুত ইঞ্জিনের ফলাফল, প্রতিদিনের জয়-পরাজয়, জোগায় সেই ডেটা, যা ধীরে ধীরে ধীর ইঞ্জিনের কোড নতুন করে লেখে। ধীর ইঞ্জিনের নতুন কোড তখন দ্রুত ইঞ্জিনের জন্য তৈরি করে এক নতুন খেলার মাঠ। এটাই ইতিহাসের সহ-বিবর্তনের নৃত্য।
ক্যাথেড্রালে বোমা: লুকাসের সমালোচনা
১৯৭৬ সালে অর্থনীতিবিদ রবার্ট লুকাস কেইনসীয় প্রতিষ্ঠানের হৃৎপিণ্ডে এক বুদ্ধিবৃত্তিক বোমা ফাটালেন। তাঁর নোবেলজয়ী গবেষণাপত্র "Econometric Policy Evaluation: A Critique" (অর্থমিতিক নীতি-মূল্যায়ন: একটি সমালোচনা)-এ তিনি উপস্থাপন করলেন লুকাসের সমালোচনা (Lucas Critique): বৃহৎ পরিসরের সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেল নির্মাণের গোটা প্রকল্পের এক ভদ্র, অ্যাকাডেমিক, আর সম্পূর্ণ বিধ্বংসী খণ্ডন।
ইতিহাস: কেইনসের পরে সামষ্টিক অর্থনীতি হয়ে উঠেছিল এক ধরনের পুরোহিততন্ত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনীতিবিদেরা অর্থনীতির বিশাল সব পরিসংখ্যানগত মডেল বানাতেন, বিশ্বাস করতেন যে তাঁরা যন্ত্রের মতো করে ব্যবস্থাটিকে সূক্ষ্মভাবে সুর বেঁধে নিতে পারবেন।
লুকাস যে সমস্যা চিহ্নিত করলেন: এই মডেলগুলো মৌলিকভাবে অকেজো ছিল, কারণ এগুলো ধরে নিত মানুষ নির্বোধ। এগুলো ধরে নিত, সরকার নীতি বদলানোর পরেও অর্থনৈতিক আচরণের "নিয়ম" একই থাকবে। লুকাস দেখালেন, এটা অযৌক্তিক। বুদ্ধিমান মানুষ আর প্রতিষ্ঠান একটি নীতির পূর্বাভাস করে নিজেদের আচরণ বদলে নেবে, ফলে যে মডেল নীতির প্রভাবের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, তা তৎক্ষণাৎ অপ্রচলিত হয়ে যাবে। সহজ বাংলায়: যে মুহূর্তে আপনি গাড়িটা চালানোর চেষ্টা করেন, গোটা ইঞ্জিন নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়।
ব্যর্থ সমাধান: এই সমালোচনা যুদ্ধোত্তর অর্থনীতির সরল আত্মবিশ্বাসকে চুরমার করে দিয়েছিল। "সমাধান" ছিল যৌক্তিক প্রত্যাশা (Rational Expectations) প্রকল্প, যা ধরে নিত যে মানুষ গড়পড়তায় নিখুঁত পূর্বাভাসদাতা, যারা অর্থনীতির সত্যিকারের মডেলটি বোঝে। এটা একটি ত্রুটিপূর্ণ অনুমানের জায়গায় বসাল একটি স্পষ্টতই অযৌক্তিক অনুমান, অভিযোজন আর শিক্ষার খোদ সমস্যাটাকেই অনুমানের জোরে উড়িয়ে দিয়ে।
দ্বৈত ইঞ্জিন মডেল দেয় প্রথম পূর্ণাঙ্গ, যান্ত্রিক সমাধান। লুকাসের সমালোচনা দুই ইঞ্জিনের মধ্যেকার প্রতিক্রিয়ার এক নিখুঁত বর্ণনা। একটি নীতিগত হস্তক্ষেপ হলো দ্রুত ইঞ্জিনের একটি কাজ। কিন্তু তা তৎক্ষণাৎ ধীর ইঞ্জিনে এক নতুন নির্বাচনী চাপ হিসেবে কাজ করে, কৌশলগুলোর জনগোষ্ঠীকে বিবর্তিত হতে বাধ্য করে। আমাদের কাঠামো এই প্রতিক্রিয়া-চক্রকে অনুমানের জোরে উড়িয়ে দেয় না; সরাসরি তার মডেল বানায়।
AI-এর আয়না: অনুমিতি বনাম প্রশিক্ষণ
এই দুই-গতির গতিবিদ্যা মানবসমাজের কোনো অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য নয়। এটা সমস্ত বুদ্ধিমান, শিক্ষণক্ষম ব্যবস্থার এক মৌলিক ধর্ম। আমরা এখন এটাকে সিলিকনে গড়ে ফেলেছি। ChatGPT-এর মতো একটি AI চলে দ্বৈত ইঞ্জিনে।
দ্রুত ইঞ্জিন হলো অনুমিতি (inference)। আপনি যখন তাকে একটা প্রশ্ন করেন, সে তার বিশাল, আগে থেকে প্রশিক্ষিত নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডে উত্তর তৈরি করে। মডেলের ওজনগুলো তখন হিমায়িত। সে কেবল তার বর্তমান কৌশলটি সম্পাদন করছে।
ধীর ইঞ্জিন হলো প্রশিক্ষণ। মাঝে মাঝে গোটা মডেলটিকে তার আগের সাফল্য আর ব্যর্থতার বিশাল ডেটাসেটের ওপর নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এটা এক ধীর, বিপুল ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া, যা AI-এর "মনের" "নিয়মগুলো"-কে মৌলিকভাবে বদলে দেয়।
লুকাসের সমালোচনাকেই AI প্রকৌশলীরা বলেন "বণ্টনগত সরণ" (distributional shift)। বছরের পর বছর ধরে তাঁরা এটা সামলানোর মতো ব্যবস্থা গড়ে আসছেন। অর্থনীতিবিদেরা সবে নাগাল ধরতে শুরু করেছেন।
চক্র ভাঙা: শেষ প্রযুক্তি-বিপ্লব
ইতিহাসবিদ কার্লোটা পেরেস দেখিয়েছেন যে প্রযুক্তি-বিপ্লবগুলো এক অনুমেয় ধরন মেনে চলে: আর্থিক উন্মাদনা আর বৈষম্যের এক অশান্ত "স্থাপনকাল"-এর পরে আসে এক স্থিতিশীল "প্রয়োগকাল" বা "স্বর্ণযুগ", যখন নতুন প্রযুক্তি সমাজের সঙ্গে একীভূত হয়।
দ্বৈত ইঞ্জিন এই চক্রটি ব্যাখ্যা করে। দ্রুত ইঞ্জিন উন্মাদনা সৃষ্টি করে। ধীর ইঞ্জিন শেষ পর্যন্ত খাপ খাইয়ে নিয়ে স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করে। বাষ্পের ক্ষেত্রে, ইস্পাতের ক্ষেত্রে, তথ্যযুগের ক্ষেত্রে এই ধরন টিকে ছিল। কিন্তু বুদ্ধিমত্তার বিপর্যাস (Intelligence Inversion) চক্রটা ভেঙে দেয়।
কেন? আগের প্রতিটি বিপ্লবে "প্রয়োগকাল"-এর মানে ছিল নতুন প্রযুক্তিগত ভিত্তি-উপাদান চালানোর জন্য মানব ব্যবস্থাপক আর জ্ঞানকর্মীদের জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান আর চাকরি সৃষ্টি। কিন্তু AI ঠিক এই সংজ্ঞানাত্মক শ্রমকেই স্বয়ংক্রিয় করে। "প্রয়োগ" সম্পন্ন করবে AI নিজেই। সামনে কোনো মানব-নেতৃত্বাধীন "স্বর্ণযুগ"-এর অপেক্ষা নেই। AI-এর ক্ষেত্রে স্থাপনকাল আর প্রয়োগকাল ধসে পড়ে একটিমাত্র, স্থায়ী দশা-রূপান্তরে (phase transition)।
আমাদের আত্মধ্বংসের ইঞ্জিন
দ্বৈত ইঞ্জিন এটাও ব্যাখ্যা করে, কেন সমাজগুলো প্রায়ই নিজেদের অপ্টিমাইজ করতে করতে পতনের দিকে নিয়ে যায়। দ্রুত ইঞ্জিন বর্তমান পরিবেশের জন্য সবচেয়ে লাভজনক কৌশলটি খুঁজে বের করে তাকে কাজে লাগায়। ধীর ইঞ্জিন তখন এই সফল কৌশলটিকে সংস্কৃতি আর প্রতিষ্ঠানে স্থায়ীভাবে গেঁথে দেয়। এটা চমৎকারভাবে কাজ করে, যতক্ষণ না পরিবেশ বদলায়।
১৯৫০-এর দশকে আমেরিকার মোটরগাড়ি শিল্পের সাফল্য এর নিখুঁত উদাহরণ। দ্রুত ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছিল এক জয়ী সূত্র। ধীর ইঞ্জিন তখন সেটাকে ডেট্রয়েটের DNA-তে স্থায়ীভাবে গেঁথে দিয়েছিল। ১৯৭০-এর দশকে যখন তেল-সংকট আঘাত হানল, পরিবেশ রাতারাতি বদলে গেল। ডেট্রয়েটের দ্রুত ইঞ্জিন খাপ খাওয়াতে পারল না, কারণ তার ধীর ইঞ্জিন তাকে আটকে ফেলেছিল একটিমাত্র, এখন অপ্রচলিত কৌশলে। যে জিনিসগুলো তাদের সফল করেছিল, ঠিক সেগুলোই এখন তাদের ব্যর্থতা নিশ্চিত করল।
এই আত্মবিধ্বংসী অপ্টিমাইজেশনকে চালায় এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক মাধ্যাকর্ষণ: MIND-অবস্থানির্ভর বাট্টা (MIND-State Dependent Discounting)। যে কর্তার MIND পোর্টফোলিও ভঙ্গুর বা ঘাটতিপূর্ণ, যার বস্তুগত নিরাপত্তা, শক্তিশালী নেটওয়ার্ক বা ভবিষ্যতের বিকল্প নেই, সে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অবস্থায় বাস করছে। নিজের ব্যবস্থাগত অস্থিতিশীলতাই তাকে ভবিষ্যৎকে ভারী বাট্টায় দেখতে বাধ্য করে, দ্রুত ইঞ্জিনের তাৎক্ষণিক লাভকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য করে। তাই ব্যাপক অনিশ্চয়তায় ভোগা একটি সমাজ হলো কাঠামোগতভাবে উঁচু বাট্টার হারের সমাজ। এটা নতুন সামাজিক চুক্তির এক ভৌত যৌক্তিকতা জোগায়: সবার জন্য MIND-এর একটি ন্যূনতম ভিত্তি নিশ্চিত করে আমরা কেবল ন্যায্য আচরণ করছি না; আমরা এমন এক সভ্যতা প্রকৌশল করছি, যা মনস্তাত্ত্বিকভাবে তার নিজের স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি চিন্তায় সক্ষম।
দুই গতির পদার্থবিদ্যা
এই দ্বৈত ইঞ্জিনের অস্তিত্ব কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটা তথ্যের পদার্থবিদ্যার এক অনিবার্য পরিণাম।
বাজারের দ্রুত ইঞ্জিন হলো সর্বোচ্চ তথ্য-অন্বেষণের জন্য নকশা করা এক ব্যবস্থা। এটা এক উচ্চ-এনট্রপি, উচ্চ-আবিষ্কারের প্রক্রিয়া।
প্রতিষ্ঠানগুলোর ধীর ইঞ্জিন হলো তথ্য-আহরণ আর সংকোচনের জন্য নকশা করা এক ব্যবস্থা। এটা সফল আবিষ্কারগুলো নিয়ে সেগুলোকে কম খরচের রুটিনে স্থায়ীভাবে গেঁথে দেয়। একটি সামাজিক রীতি হলো সফল আচরণের এক অতি-সংকুচিত অ্যালগরিদম। এটা এক নিম্ন-এনট্রপি, কম খরচের প্রক্রিয়া।
একটি জীবন্ত, বুদ্ধিমান অর্থনীতির দুটোই থাকতে হবে। এদের মধ্যেকার টানাপোড়েনই একটি শিক্ষণক্ষম ব্যবস্থার সংজ্ঞা। এই গতিবিদ্যা বোঝা হলো এমন প্রতিষ্ঠানের নকশার পথে প্রথম পদক্ষেপ, যা AI-চালিত জগতের নজিরবিহীন গতির মধ্য দিয়ে সত্যিই পথ চলতে পারে, আর এটাই আমাদের মিথোজীবী নীলনকশার মূল চ্যালেঞ্জ।