1. বুদ্ধিমত্তার বিপর্যাস
"একটি নতুন বৈজ্ঞানিক সত্য তার বিরোধীদের রাজি করিয়ে, তাদের আলো দেখিয়ে জয়ী হয় না; বরং জয়ী হয় এই কারণে যে তার বিরোধীরা একসময় মারা যায়, আর এমন এক নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠে, যার কাছে সেই সত্য পরিচিত।" — মাক্স প্লাঙ্ক
যে নকশা পৃথিবীকে ভেঙে দেয়
১৮১১ সালে, গভীর রাতে, নটিংহামের কাছে শ্রমিকেরা জড়ো হয়েছিল। মুখে কয়লার কালি মাখা, পরিচয় গোপন, তারা চলাফেরা করছিল সৈনিকের নিখুঁত শৃঙ্খলায়। এরাই ছিল আদি লুডাইট (Luddites)। আমাদের যে কার্টুনসুলভ ইতিহাস গেলানো হয়েছে, তার উল্টো, তারা প্রগতিভীরু নির্বোধ ছিল না। তারা ছিল দক্ষ কারিগর, যারা ঠিক বুঝতে পারছিল কী ঘটছে। যন্ত্রপাতি কেবল তাদের কাজ কেড়ে নিচ্ছিল না; মানুষ হিসেবে তাদের গোটা জীবনধারাকেই অপ্রচলিত করে দিচ্ছিল।
তারা তাঁতের কাঠামো ভেঙেছিল অজ্ঞতা থেকে নয়, স্বচ্ছ দৃষ্টি থেকে। কারখানার মালিকেরা যা দেখতে পারছিল না, বা দেখতে চাইছিল না, তারা তা দেখতে পাচ্ছিল। এটা কেবল উৎপাদনের এক নতুন উপায় ছিল না। এটা ছিল কারিগরের অবসান, আর বদলযোগ্য শ্রমিকের জন্ম। সময়রেখাটুকু ছাড়া আর সব বিষয়েই তারা ঠিক ছিল। দুশো বছর লেগেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যন্ত্র এসে হাজির হয়েছে মনের দরজায়।
গত দশ হাজার বছরে চারবার অর্থনৈতিক মূল্যের মৌলিক উৎস উল্টে গেছে। প্রতিবার পৃথিবী কেবল বদলায়নি। ভেঙে পড়েছে, তারপর নতুন করে গড়ে উঠেছে এমন কিছুতে, যা চেনা যায় না। যে সভ্যতাগুলো পালাবদলটা বুঝেছিল, তারা সমৃদ্ধ হয়েছে। যারা পুরোনো নিয়ম আঁকড়ে ধরেছিল, তারা হয়ে গেছে প্রত্নতাত্ত্বিক স্তর, বিজনেস স্কুলে বলা সতর্কতার গল্প, যে বিজনেস স্কুলগুলো নিজেরাই এক দশকের মধ্যে আর থাকবে না।
আমরা ঠিক এই মুহূর্তে চতুর্থ এবং শেষ বিপর্যাসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এটা ঘটছে আগের যেকোনোটার চেয়ে একশো গুণ দ্রুত। আর অন্যগুলোর মতো নয়, এখানে পিছু হটার কোনো জায়গা নেই।
প্রথম বিপর্যাস: যখন ভূমিই আর সবকিছু রইল না
দশ সহস্রাব্দ ধরে সভ্যতার ইঞ্জিন চলেছে এক সরল, নির্মম যুক্তিতে: ভূমি নিয়ন্ত্রণ করো, পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করো। সুমের থেকে স্পেন পর্যন্ত প্রতিটি সাম্রাজ্য নিজেকে গড়েছে এই সমীকরণের ওপর। ভূমি মানে খাদ্য। খাদ্য মানে টিকে থাকা। টিকে থাকা মানে ক্ষমতা। ফারাওরা তাদের শক্তি মাপত প্লাবনভূমিতে, রোমানরা গমের খেতে।
এটা ছিল ভূমির আধিপত্যের যুগ। এই যুগ এক বিশেষ ধরনের মানুষ তৈরি করেছিল। কৃষকেরা আক্ষরিক অর্থেই জমির সঙ্গে বাঁধা ছিল, ভূমিদাস, যাদের মূল্য হিসাব হতো তারা কত একর জমি চষতে পারে তা দিয়ে। অভিজাতেরা কেবল ধনী ছিল না; সত্তাগতভাবেই তারা আলাদা ছিল, দলিল আর উপাধির জোরে তাদের রক্ত যেন কোনোভাবে কাদামাখা জনতার চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল।
প্রথম ফাটল দেখা দিল ভেনিসে, এমন এক শহরে যার উল্লেখ করার মতো কোনো কৃষিজমিই ছিল না। তার বদলে সে ইউরোপের সবচেয়ে ধনী শহর হয়ে উঠল এই উপলব্ধি থেকে যে, পণ্য যে জমিতে উৎপন্ন হয় তা নিয়ন্ত্রণের চেয়ে পণ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারপর, ১৭৫০ সালের আশপাশে, সবকিছু গতি পেল। জেমস ওয়াট নামে এক স্কটিশ যন্ত্রনির্মাতা একটি বাষ্পীয় ইঞ্জিনে একটি আলাদা কনডেনসার জুড়ে দিলেন, আপাতদৃষ্টিতে সামান্য এক উন্নতি, যা একটি গোটা জগতের অবসান ঘটাল।
ম্যানচেস্টারে ভবিষ্যৎ নিজের আগমন ঘোষণা করল ধোঁয়া আর যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে। শ্রমজীবী পাড়াগুলোতে গড় আয়ু নেমে এল সতেরো বছরে। কিন্তু কলগুলো একদিনে যত কাপড় তৈরি করত, একশোটা গ্রাম এক বছরেও তা পারত না। সমীকরণ উল্টে গিয়েছিল। ভূমিহীন এক মেধাবী বণিক এখন ক্ষমতাবান; উর্বর খেতের মালিক এক নির্বোধ রাজা নিছক সেকেলে কৌতূহলের বস্তু। মূল্যের উৎস সরে গিয়েছিল আপনি কী মালিকানায় রাখেন তা থেকে, আপনি কী সংগঠিত করতে পারেন তার দিকে। একর থেকে কারখানায়, মাটি থেকে ব্যবস্থায়। মূল্যের উৎস সরে গিয়েছিল স্থির সম্পদ থেকে উৎপাদনের গতিশীল প্রবাহে।
দ্বিতীয় বিপর্যাস: যখন হাত অপ্রচলিত হয়ে গেল
শ্রমের আধিপত্যের যুগ টিকেছিল দুই শতাব্দী, স্থায়ী মনে হওয়ার মতো যথেষ্ট দীর্ঘ সময়। ইউনিয়ন গড়ে উঠল। অধিকার অর্জিত হলো। আট ঘণ্টার কর্মদিবস, সাপ্তাহিক ছুটি, এমনকি এই ধারণাটিও যে শ্রমিকেরা নিছক উপকরণ নয়, মানুষ। মনে হচ্ছিল এ এক স্থিতিশীল ভারসাম্য।
কিন্তু শ্রমিক আন্দোলন যখন তার বিজয় উদ্যাপন করছিল, ঠিক তখনই পায়ের নিচের মাটি আবার সরে যাচ্ছিল। ১৯৪৭ সালে বেল ল্যাবস ট্রানজিস্টর উদ্ভাবন করল। ১৯৭০ নাগাদ একটি কম্পিউটার একটি গোটা উৎপাদন লাইন চালাতে পারত। নির্ণায়ক মুহূর্তটি এল রিভার রুজে, ফোর্ডের মুকুটমণিতে। ১৯৩০ সালে সেখানে কাজ করত ১,০০,০০০ শ্রমিক। ১৯৯০ নাগাদ মাত্র ৬,০০০ জন দিয়েই সেখানে আরও বেশি গাড়ি তৈরি হচ্ছিল। হারিয়ে যাওয়া ৯৪,০০০ জন আরও ভালো কাজ পায়নি। তারা কোনো কাজই পায়নি। যন্ত্রগুলো কেবল মানুষের শ্রমে সাহায্য করেনি; তার জায়গা দখল করে নিয়েছিল।
এটা ছিল পুঁজির আধিপত্যের যুগ। মূল্য উধাও হয়নি; সরে গিয়েছিল। সফটওয়্যারের পুঁজিকে কাজে লাগিয়ে মাইক্রোসফটের একজন মাত্র প্রকৌশলী অ্যাসেম্বলি লাইনের হাজার শ্রমিকের চেয়ে বেশি মূল্য সৃষ্টি করতে পারতেন। মুনাফা যেত না তাদের কাছে যারা সবচেয়ে কঠোর পরিশ্রম করত, যেত তাদের কাছে যারা উৎপাদনের উপায়ের মালিক। আর ক্রমশ সেই উৎপাদনের উপায় আর কারখানা ছিল না, ছিল অ্যালগরিদম; একবার কিছু লিখে ফেলে চিরকাল এক স্ব-শক্তিবর্ধক চক্রে তা দিয়ে মূল্য সৃষ্টি করিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।
তৃতীয় বিপর্যাস: যখন পুঁজি নিজেই ক্ষণস্থায়ী হয়ে উঠল
শ্রম থেকে পুঁজিতে রূপান্তর ছিল যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু বোধগম্য। একটা কারখানা চোখে দেখা যেত। একটা যন্ত্র ছুঁয়ে দেখা যেত। কিন্তু ২০০০ সালের আশপাশে আরও অদ্ভুত কিছু ঘটতে শুরু করল। পুঁজি নিজেই অশরীরী হতে শুরু করল।
ভেবে দেখুন: ১৯৯৮ সালে Kodak-এ কাজ করত ১,৭০,০০০ মানুষ, আর তার মূল্য ছিল একত্রিশ বিলিয়ন ডলার। ২০১২ সালে Facebook এক বিলিয়ন ডলারে Instagram কিনে নিল। Instagram-এর কর্মী ছিল তেরো জন। কোনো কারখানা নেই। কোনো মজুত নেই। কোনো ভৌত পণ্য নেই। আছে কেবল বিপুল পরিসরে মানুষের মনোযোগকে সংগঠিত করার ক্ষমতা।
এক দশকেরও কম সময়ে গোটা ফটোগ্রাফি শিল্প বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। মানুষ ছবি তোলা বন্ধ করেছিল বলে নয়, বরং অসীম সংখ্যক ছবি তুলতে শুরু করেছিল বলে। যে অভাব ছবিকে মূল্য দিত, তা হারিয়ে গেল। মাত্র পঞ্চান্ন জন কর্মী নিয়ে WhatsApp বিক্রি হলো উনিশ বিলিয়ন ডলারে, বৈশ্বিক SMS শিল্প আর তার কয়েক লক্ষ কর্মীকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে। মূল্য রূপ নিয়েছিল নতুন কিছুতে: বিক্রি করার মতো কোনো বস্তু নয়, পুনরাবৃত্তি করার মতো কোনো প্রক্রিয়া নয়, বরং খোদ নেটওয়ার্কের অদৃশ্য কাঠামো।
চতুর্থ বিপর্যাস: বুদ্ধিমত্তার ঘটনা
এবার আমরা বর্তমানে এসে পৌঁছেছি। শেষ বিপর্যাস। যেখান থেকে পিছু হটার কোনো পথ নেই।
২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর সবকিছু বদলে গেল। OpenAI জনসাধারণের জন্য ChatGPT উন্মুক্ত করল। পাঁচ দিনের মধ্যে দশ লক্ষ ব্যবহারকারী। দুই মাসের মধ্যে দশ কোটি। মানব ইতিহাসে যেকোনো প্রযুক্তির দ্রুততম গ্রহণ। কিন্তু গতিটা আসল কথা নয়। আসল কথা হলো এর তাৎপর্য। মানব ইতিহাসের পুরোটা জুড়ে বুদ্ধিমত্তা ছিল শ্রমের একটি রূপ, দুষ্প্রাপ্য এবং মানুষের খুলির ভেতরে বন্দি। এখন, প্রথমবারের মতো, বুদ্ধিমত্তা হয়ে উঠেছে পুঁজির একটি রূপ। একে অসীমবার নকল করা যায়। এটি নিজেকে পুনরাবৃত্তভাবে উন্নত করে।
ব্যাপারটা হাতে-কলমে দেখাই। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে একজন সাধারণ মার্কিন লেখক ঘণ্টায় প্রায় ৩৫ ডলার আয় করতেন। ২০২৩ সালের মার্চে বড় মডেলগুলোর API অ্যাক্সেস দিয়ে আপনি 'GPT-4'-এর মোটামুটি ছয় সেন্টের আউটপুটে, সঙ্গে ছোট্ট একটা প্রম্পট জুড়ে, ৭৫০ শব্দের একটি খসড়া তৈরি করিয়ে নিতে পারতেন।
'gpt-3.5-turbo'-এর দাম ছিল প্রতি ১,০০০ টোকেনে ০.০০২ ডলার, যা ছোট খসড়ার দাম এক সেন্টের ভগ্নাংশে নামিয়ে আনল। এটা উৎপাদনশীলতার কোনো উন্নতি নয়। এটা সংজ্ঞানের জন্য এক নতুন মূল্য-ব্যবস্থা। যখন উচ্চমানের লেখার প্রান্তিক ব্যয় শূন্যের কাছাকাছি চলে আসে, তখন অভাবের জন্য গড়া অর্থনীতি দুমড়ে পড়তে শুরু করে।
কিন্তু সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনটি কেবল এই নয় যে AI মনের জায়গা নিচ্ছে। বরং এই যে, এটি পৃথিবীতে এমন এক নতুন ধরনের শ্রম নিয়ে আসছে, যার ভৌত ভিত্তি সম্পূর্ণ আলাদা। এটাই বিপাকীয় ফাটল (Metabolic Rift)।
দশ হাজার বছর ধরে সমস্ত শ্রম সম্পাদন করেছে মানুষ নামের বিপাকীয় ইঞ্জিন। সক্রিয় থাকতে আমাদের দরকার খাদ্য, আশ্রয়, বিশ্রাম, আর এক জটিল সামাজিক কাঠামো। আমাদের অর্থনৈতিক মূল্য অবিচ্ছেদ্যভাবে আমাদের জীববিদ্যার সঙ্গে বাঁধা ছিল। AI আর রোবোটিক্স হলো অ-বিপাকীয় শ্রম। এদের দরকার কেবল বিদ্যুৎ। এদের লালন করার মতো কোনো জীববিদ্যা নেই।
এ কারণেই এই চতুর্থ বিপর্যাস চূড়ান্ত। যখন হাত অপ্রচলিত হলো, আমরা মোড় নিলাম মনের দিকে। কিন্তু যখন আমাদের মন এমন এক ধরনের শ্রমের কাছে প্রতিযোগিতায় হেরে যায়, যার খেতে, ঘুমোতে বা বাঁচতে হয় না, তখন মোড় নেওয়ার মতো আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকে না। আমরা কেবল আরও দক্ষ এক প্রতিযোগীর মুখোমুখি নই; আমরা মুখোমুখি অর্থনৈতিক জীবনের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শ্রেণির।

অপ্রচলনের গণিত
এই হলো সেই নির্মম গণিত, যা কোনো রাজনীতিবিদ মুখ ফুটে বলবেন না: ক্রমবর্ধমান সংখ্যাগরিষ্ঠ সংজ্ঞানাত্মক কাজে একজন মানুষের অর্থনৈতিক মূল্য কেবল AI-এর চেয়ে কম নয়। তা ঋণাত্মক।
একজন জ্ঞানকর্মীর মোট খরচ ভেবে দেখুন: বেতন, সুযোগ-সুবিধা, অফিসের জায়গা, ব্যবস্থাপনার উপরি খরচ, প্রশিক্ষণের সময়, অসুস্থতার ছুটি, চাকরি ছেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি। এবার ভাবুন একটি AI-এর খরচ: API ফি আর বিদ্যুৎ। AI চব্বিশ ঘণ্টা, সপ্তাহের সাত দিন একই মানে কাজ করে। আপনার নির্দেশকে সে কখনো ব্যক্তিগত সমালোচনা হিসেবে নেয় না। তার অনুপ্রেরণার দরকার হয় না। সে দলাদলি করে না। ভালো প্রস্তাব পেয়ে চলে যায় না।
একজন রেডিওলজিস্ট তেরো বছর প্রশিক্ষণ নেন, আর বছরে চার লক্ষ ডলার আয় করেন। AI ব্যবস্থাগুলো এখন বহু ধরনের ক্যানসার মানব রেডিওলজিস্টদের চেয়ে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করে। তাদের সমান ভালো নয়। তাদের চেয়ে ভালো। রেডিওলজি AI-এর খরচ প্রতি স্ক্যানে কয়েক পয়সা, আর প্রতিটি রোগনির্ণয়ের সঙ্গে সে উন্নত হয়। মানব রেডিওলজিস্ট প্রথম স্ক্যান পড়ুন বা হাজারতম, খরচ একই। AI আরও ভালো আর আরও সস্তা হয়। মানুষ কেবল ক্লান্ত হয়।
S&P 500-এর কোম্পানিগুলো এটা ইতিমধ্যেই বুঝে ফেলেছে। এজন্যই তাদের রাজস্ব বেড়েই চলেছে, অথচ কর্মীর সংখ্যা কমছে। তারা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির জন্য অপেক্ষা করছে না। তারা অপেক্ষা করছে AI আর একটুখানি ভালো হওয়ার জন্য, যার পরে আপনাকে তাদের আর একেবারেই দরকার হবে না।
মোড় নেওয়ার আর কোনো জায়গা নেই
আগের বিপর্যাসগুলো সবসময় মানুষের জন্য পিছু হটার কোনো না কোনো জায়গা রেখে গিয়েছিল। যখন ভূমি শ্রমের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষ শ্রমিক হলো। যখন শ্রম পুঁজির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষ জ্ঞানকর্মী হলো। যখন জ্ঞানের কাজ AI-এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে, তখন মানুষ কী হবে?
প্রচলিত উত্তর হলো "সৃজনশীল মানুষ আর পরিচর্যাকারী।" কিন্তু গত মাসে AI-এর তৈরি একটি গান স্ট্রিমিং চার্টের শীর্ষে উঠেছে। অন্ধ গবেষণায় (blind studies) AI থেরাপিস্টদের ক্ষেত্রে রোগীরা মানব থেরাপিস্টদের চেয়ে বেশি সন্তুষ্টির কথা জানাচ্ছেন। আশ্রয়স্থলগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। আরেকটু পরিশীলিত উত্তর হলো "AI প্রশিক্ষক আর তত্ত্বাবধায়ক।" কিন্তু এটা বড়জোর এক অন্তর্বর্তী অবস্থা। AI ব্যবস্থাগুলো ইতিমধ্যেই অন্য AI ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
সৎ উত্তর হলো, আমরা জানি না। অর্থনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবার আমরা এমন এক বিপর্যাসের মুখোমুখি, যেখানে নামার মতো কোনো স্পষ্ট জায়গা নেই। আমরাই সেই প্রজন্ম, যারা এই ছেদের ভেতর দিয়ে বাঁচবে। শেষ মানুষ, যারা মনে রাখবে কখন মানুষের চিন্তার অর্থনৈতিক মূল্য ছিল। প্রথম মানুষ, যারা আবিষ্কার করবে এরপর কী আসে।
আমাদের অবস্থানের অদ্ভুত কাব্য
আমরা ইতিহাসের এক অনন্য মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা দুটো তীরই দেখতে পাচ্ছি: যে পুরোনো পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছি, আর যে নতুন পৃথিবী জন্ম নিচ্ছে। আমরাই শেষ প্রজন্ম, যারা অভাবকে মৌলিক অর্থনৈতিক সত্য হিসেবে মনে রাখবে। শেষ প্রজন্ম, যারা কাজকে মূল্যের সমার্থক ভাবে। শেষ প্রজন্ম, যারা বিশ্বাস করে বুদ্ধিমত্তা সহজাতভাবেই মানবিক।
আমাদের কাছে সামন্ততন্ত্র যতটা সেকেলে মনে হয়, আমাদের সন্তানদের কাছে আমাদের অর্থনীতিও ততটাই সেকেলে মনে হবে।
কিন্তু আমরাই প্রথম প্রজন্ম, যারা পরবর্তী অধ্যায় গড়ার সুযোগ পাচ্ছে। প্রথম প্রজন্ম, যারা অভাবের বাইরের অর্থনীতি কল্পনা করবে। প্রথম প্রজন্ম, যারা অর্থনৈতিক উপযোগিতার বাইরে মানুষের মূল্য সংজ্ঞায়িত করবে। প্রথম প্রজন্ম, যারা "আমরা কীভাবে কাজ করব?" নয়, জিজ্ঞেস করবে "আমরা কেন আছি?"
সেটাই আসল বিপর্যাস। কেবল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নয়, অস্তিত্ব নিয়ে আমাদের অনুমানগুলোরও। যন্ত্রগুলো কেবল আমাদের কাজ কেড়ে নেয়নি। তারা আমাদের মুক্ত করেছে সেই মিথ্যা থেকে যে, আমাদের কাজই আমাদের পরিচয়।
সংকটের ভেতরে লুকানো পছন্দ
বুদ্ধিমত্তার বিপর্যাস (Intelligence Inversion) অন্যগুলোর মতো নয়। এটা কেবল দ্রুততর আর ব্যাপকতর নয়। এটা চূড়ান্ত। পঞ্চম কোনো বিপর্যাস আসবে না, কারণ উল্টানোর মতো আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। যখন বুদ্ধিমত্তা নিজেই প্রচুর হয়ে ওঠে, আর তাকে কাজে লাগানো শ্রম হয়ে ওঠে অ-বিপাকীয়, তখন অভাব-নির্ভর অর্থনীতির ধারণাটাই অর্থ হারিয়ে ফেলে।
এই চূড়ান্ততা আমাদের সামনে একটি পছন্দ হাজির করে। আমরা কেবল খাপ খাইয়ে নিতে পারি না, কারণ নতুন বাস্তবতার মধ্যে আমাদের নিজেদের অপ্রচলনও অন্তর্ভুক্ত। লুডাইটরা তাদের পৃথিবীর সঙ্গে কী ঘটছে তা স্পষ্ট দেখতে পেয়ে ঠিকই করেছিল। তারা ভুল করেছিল এটা ভেবে যে ধ্বংস দিয়ে ভবিষ্যৎ থামানো যায়। আমাদের সামনে সুযোগ আছে একই সঙ্গে স্বচ্ছদৃষ্টি এবং গঠনমূলক হওয়ার।
কিন্তু তা করতে হলে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে খেলায় থাকা শক্তিগুলোর গভীর পদার্থবিদ্যা। আমাদের দেখতে হবে মূল্যপ্রবাহের সেই ভিন্ন ভিন্ন ধরন, যা আমাদের অতীতকে গড়েছে এবং আমাদের ভবিষ্যৎকে সংজ্ঞায়িত করবে। মরণাপন্ন প্রতিমানের ভাষা আমাদের শিখতে হবে, যাতে তার মিথ্যাগুলো চিনতে পারি।
এবার সেগুলোর সবকটিকে চুরমার করার সময়।