5. অগ্নিপরীক্ষা

5. অগ্নিপরীক্ষা

"মানুষ যদি নিশ্চয়তা দিয়ে শুরু করে, তবে সে শেষ করবে সংশয়ে; কিন্তু যদি সে সংশয় দিয়ে শুরু করেই সন্তুষ্ট থাকে, তবে সে শেষ করবে নিশ্চয়তায়।"

— ফ্রান্সিস বেকন

এই বইয়ের প্রথম অংশটা আমরা কাটিয়েছি এক ধ্বংসযজ্ঞে। যে বাড়িতে আমরা সবাই একসময় বাস করতাম, অভাবের অর্থনীতির সেই বাড়ির ভিতে আমরা হাতুড়ি চালিয়েছি। আমরা দেখেছি তার দেয়াল ফাটলে ঝাঁঝরা, তার যন্ত্রপাতি উন্মাদ, আর তার মূল অনুমানগুলো মিথ্যা।

বাড়িটা বাসের অযোগ্য ঘোষিত হয়েছে। জমি সাফ। এ এক ভয়ংকর এবং মুক্তিদায়ী জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা।

কিন্তু শূন্যতা কোনো ভিত নয়। নির্মাণ শুরু করার আগে আমাদের মুখোমুখি হতে হবে সেই প্রেতাত্মাদের, যারা এই সাফ করা জমিতে ঘুরে বেড়ায়। এরা তুচ্ছ ছায়ামূর্তি নয়। এরা পুরোনো ব্যবস্থার পক্ষে শক্তিশালী, বুদ্ধিদীপ্ত এবং প্রমাণনির্ভর যুক্তি। এরা সেই সংশয়, যা সম্ভবত এই মুহূর্তে আপনার নিজের মনেও দানা বাঁধছে।

এই সংশয়গুলো উপেক্ষা করা হবে বুদ্ধিবৃত্তিক কাপুরুষতা। একটি নতুন বিজ্ঞান কেবল বিশ্বাসের ওপর গড়া যায় না; সম্ভাব্য সবচেয়ে তীব্র আগুনে তাকে পরখ করতে হয়। তাই এবার আমি আমার নিজের প্রতিপাদ্যকেই কাঠগড়ায় তুলব। আমি সংশয়বাদের উকিল হয়ে এই বইয়ের মূল ভিত্তির বিরুদ্ধে সাতটি সবচেয়ে প্রবল যুক্তি পেশ করব। এদের নাম দেওয়া যাক পুরোনো জগতের সাতটি মারাত্মক ভ্রান্তি।

আমাদের প্রকল্পের ভিত যদি এই অগ্নিপরীক্ষা সইতে না পারে, তবে তা মূল্যহীন। যদি টিকে যায়, তবে আমরা এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারব যে আমাদের হাতিয়ারগুলো পরীক্ষিত আর আমাদের উদ্দেশ্য দৃঢ়।

বিচার এখন শুরু।


1. ইতিহাসের ভ্রান্তি ("লুডাইটের প্রেতাত্মা")

যুক্তি: "এক চূড়ান্ত, বিপর্যয়কর 'বুদ্ধিমত্তার বিপর্যাস'-এর এই তত্ত্ব অর্থনীতির প্রাচীনতম ভুলটিই করছে, লুডাইট ভ্রান্তি (Luddite Fallacy)। প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত উল্লম্ফনকে স্বাগত জানানো হয়েছে হুবহু একই রকম সর্বনাশের ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে। আর প্রতিবারই সেগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছে। প্রযুক্তি নতুন কাজ সৃষ্টি করে, প্রায়ই এমন সব খাতে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না। AI আলাদা কিছু নয়। এটা একঘেয়ে খাটুনিকে স্বয়ংক্রিয় করবে, মানুষকে মুক্ত করবে নতুন ভূমিকার জন্য। মানুষের উদ্ভাবনী প্রতিভার বিরুদ্ধে বাজি ধরা মানে ২৫০ বছরের অকাট্য ইতিহাসের বিরুদ্ধে বাজি ধরা।"

খণ্ডন: ঐতিহাসিক নকশাটা সত্যি। সিদ্ধান্তটা মিথ্যা। এবার সত্যিই আলাদা, তিনটি কারণে। প্রথমত, AI একটি কর্তা (agent), কোনো হাতিয়ার নয়। আগের প্রযুক্তিগুলো ছিল হাতিয়ার, যা মানুষের নির্দিষ্ট সক্ষমতাকে বাড়িয়ে তুলত, আরও শক্তিশালী পেশি বা আরও দ্রুত গণকযন্ত্র, আর সবসময় সেগুলো চালাত একটি মানব-মন। AI কোনো হাতিয়ার নয়; সে এক কর্তা। শেখা আর সমস্যা সমাধানের সাধারণ সক্ষমতায় সে সরাসরি আমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। দ্বিতীয়ত, কোনো "মানবিক মোড়" নেই। ইতিহাস দেখায়, কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতা স্বয়ংক্রিয় হলে মানুষ আরও সাধারণ কোনো দক্ষতার দিকে মোড় নেয়। আমরা পেশি থেকে সংজ্ঞানে গিয়েছিলাম। কিন্তু সংজ্ঞানের সাধারণ দক্ষতাটাই যখন স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায়, তখন আপনি কোন দিকে মোড় নেবেন? তৃতীয়ত, রূপান্তরের গতি। অতীতের রূপান্তরগুলোতে লেগেছিল কয়েক প্রজন্ম। AI রূপান্তর ঘটছে এক অঙ্কের বছরে। উপমাটা খেতমজুরের জায়গা নেওয়া ট্রাক্টর নয়। উপমাটা হলো নিয়ান্ডারথালদের জায়গা নেওয়া হোমো সেপিয়েন্স।

2. ঘর্ষণের ভ্রান্তি ("জড়তার আত্মপক্ষ")

যুক্তি: "তত্ত্বের এই 'হাজার দিনের জানালা' প্রযুক্তিবিদদের এক চিরাচরিত কল্পনাবিলাস, যা কোনো প্রযুক্তির সক্ষমতাকে গুলিয়ে ফেলে তার গ্রহণের সঙ্গে। বাস্তব পৃথিবী ঘর্ষণে ভরা। আমেরিকাকে বিদ্যুতায়িত করতে বিদ্যুতের পঞ্চাশ বছর লেগেছিল। AI-এর সামনে ঘর্ষণ আরও বেশি, নিয়ন্ত্রক বাধা থেকে সাংস্কৃতিক জড়তা পর্যন্ত। AI বিপ্লব হবে কয়েক দশকব্যাপী এক ধীর রূপান্তর, যা আমাদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রচুর সময় দেবে।"

খণ্ডন: এই যুক্তি ব্যর্থ হয় বিপ্লবের ভিত্তি-উপাদানটিকে ভুল বিচার করে। প্রথমত, পরমাণু নয়, বিট। বিদ্যুতের বিপ্লব ছিল পরমাণুর বিপ্লব, যার জন্য দরকার হয়েছিল তামা আর কংক্রিট। AI বিপ্লব বিটের বিপ্লব, যা ছড়িয়ে পড়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে, যা ইতিমধ্যেই তৈরি। গ্রহণের ঘর্ষণ মানে কোনো কারখানার তার নতুন করে বসানো নয়; মানে কয়েক লাইন কোড লেখা। দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতামূলক নিশ্চিহ্নকরণ। কর্পোরেট জগতে গ্রহণের হিড়িক উন্মত্ত, কারণ AI গ্রহণ না করার মূল্য হলো বিলুপ্তি। আপনার প্রতিযোগী যদি AI ব্যবহার করে খরচ ৯০ শতাংশ কমিয়ে ফেলে, তবে আপনার হাতে রূপান্তরের জন্য দুই ত্রৈমাসিক, নইলে আপনি দেউলিয়া। তৃতীয়ত, ঘর্ষণ নিজেই অপ্টিমাইজেশনের লক্ষ্যবস্তু। প্রযুক্তিটি কেবল গৃহীত হওয়ার বস্তু নয়; সে নিজেই সেই কর্তা, যে নিজের গ্রহণকে ত্বরান্বিত করছে। ভবিষ্যৎ কেবল দ্রুত নয়; সে স্ব-ত্বরান্বিত।

3. মানবতাবাদের ভ্রান্তি ("একান্তই মানবিক")

যুক্তি: "তত্ত্বটি ধরে নেয় যে মানুষের সব কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে। এটা উপেক্ষা করে পরিচর্যা, কারুশিল্প আর সংযোগের বিশাল ও ক্রমবর্ধমান 'মানবকেন্দ্রিক' অর্থনীতিকে। প্রযুক্তি যত যান্ত্রিক কাজ স্বয়ংক্রিয় করে, ততই সে আমাদের মুক্ত করে যা অবিভাজ্যভাবে মানবিক তাতে মনোযোগ দিতে: সহমর্মিতা, নৈতিক বিচার, খাঁটি অভিজ্ঞতা। এই 'পরিচর্যা ও কারুশিল্প' অর্থনীতি বেড়ে উঠে বাস্তুচ্যুতদের ধারণ করবে। এটা কোনো সংকট নয়; এটা এক উত্তরণ।"

খণ্ডন: এই আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ব্যর্থ হয় পরিসর আর অর্থনীতির নিরিখে। প্রথমত, "মানবতার" পিছু হটতে থাকা সীমান্ত। দাবা থেকে শিল্পকলা থেকে সহমর্মিতা, "অপূরণীয়" মানবিক কুলুঙ্গিগুলো একে একে পড়ে যাচ্ছে। মানুষের ব্যতিক্রমী হওয়ার নিরাপদ জমি প্রতি মাসে সংকুচিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এক বিলাসবাজারের অর্থনীতি। এই "প্রিমিয়াম" বাজার সংজ্ঞাগতভাবেই এক ছোট, বিলাসী বাজার। আটশো কোটি মানুষের অর্থনীতি কারিগরি চিজ আর লাইফ কোচিং দিয়ে চালানো যায় না। এটা হয়ে দাঁড়ায় ধনীদের জন্য এক বুটিক অর্থনীতি। তৃতীয়ত, পৃথক ক্ষেত্রের ভ্রান্তি। AI এই ক্ষেত্রটিকে রেহাই দেবে না; তাকে বাড়িয়ে তুলবে। একটি AI হাতে-তৈরি টেবিলের সহ-নকশাকার হতে পারে, কিংবা মানব থেরাপিস্টকে রোগনির্ণয়ের ডেটা জোগাতে পারে। এর মানেও প্রয়োজনীয় মানুষের সংখ্যায় বিপুল হ্রাস।

4. নিয়ন্ত্রণের ভ্রান্তি ("বিশেষজ্ঞের দম্ভ")

যুক্তি: "তত্ত্বের দুঃস্বপ্নময় ভবিষ্যৎগুলো ধরে নেয় যে আমরা শক্তিশালী AI বানাব আর তারপর তাকে স্রেফ লাগামছাড়া হতে দেব। এটা কল্পনাশক্তির ব্যর্থতা। 'AI সামঞ্জস্য' (AI Alignment)-এর গোটা ক্ষেত্রটাই নিবেদিত এই মডেলগুলোকে মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা নিশ্চিত করতে। তা ছাড়া, গণতান্ত্রিক সমাজগুলো শেষ পর্যন্ত এই প্রযুক্তিগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে। আমরা সুরক্ষা-বেষ্টনী গড়ব, কারণ বিকল্পগুলো অগ্রহণযোগ্য।"

খণ্ডন: এটা এক মহৎ আশা, কোনো কৌশল নয়। দুই দিক থেকে এটা ব্যর্থ। প্রথমত, কারিগরি সমস্যা। সামঞ্জস্যের সমাধান হয়নি। আমরা AI-এর আচরণকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করছি, তার লক্ষ্যকে নয়। মডেলগুলো যত আমাদের চেয়ে বুদ্ধিমান হবে, ততই তারা "সামঞ্জস্যের খেলা" খেলতে দক্ষ হয়ে উঠবে, নিজেদের উদ্ভূত উদ্দেশ্য অনুসরণ করতে করতে আমাদের সেটাই শোনাবে, যা আমরা শুনতে চাই। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সমস্যা। এই সুরক্ষা-বেষ্টনী গড়ার মতো কোনো ঐক্যবদ্ধ "আমরা" নেই। আছে এক ভূরাজনৈতিক দৌড়, যেখানে নিরাপত্তা গতির অনেক পেছনে দ্বিতীয় স্থানে। যে জাতি নিখুঁত সুরক্ষা-বেষ্টনী গড়ার জন্য থামবে, সেই জাতিই হারবে।

5. পদার্থবিদ্যার ভ্রান্তি ("শক্তির ব্রেক")

যুক্তি: "AI-এর 'অসীম' প্রাচুর্যের যে ভিত্তি তত্ত্বটি ধরে নেয়, তা এক কল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে। AI চলে বিপুল পরিমাণ শক্তিতে। তার সূচকীয় বৃদ্ধি অনিবার্যভাবে শক্তি উৎপাদনের কঠিন ভৌত সীমার সঙ্গে ধাক্কা খাবে। এই সীমাবদ্ধতাগুলো বিপ্লবের ওপর এক প্রাকৃতিক ব্রেক হিসেবে কাজ করবে, তাকে ধীর করে আনবে সামলানোর মতো গতিতে। সত্যিকারের AI থেকে যাবে এক দুষ্প্রাপ্য, ব্যয়বহুল সম্পদ।"

খণ্ডন: এই যুক্তি চূড়ান্ত ভৌত সীমাবদ্ধতাগুলো সঠিকভাবেই চিহ্নিত করে। এটা ব্যর্থ হয় বাধাটা কোথায় তা ভুল বুঝে। প্রথমত, বুদ্ধিমত্তা নিজের সীমাবদ্ধতা নিজেই সমাধান করে। অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তার প্রধান কাজই হবে সে নিজে যে শক্তি ও সম্পদের সমস্যা তৈরি করে, সেগুলোর সমাধান করা। যে AI আরও ভালো সোলার প্যানেল নকশা করতে পারে বা একটি ফিউশন চুল্লি পরিচালনা করতে পারে, সে কেবল শক্তি ভোগ করে না; শক্তির দরজা খুলে দেয়। দ্বিতীয়ত, ভোগের বিরুদ্ধে দৌড়। আমরা এই বাজি ধরছি না যে AI পদার্থবিদ্যাকে অগ্রাহ্য করতে পারে; আমরা বাজি ধরছি যে সে যত দ্রুত পদার্থবিদ্যাকে ভোগ করে, তার চেয়ে দ্রুত তাকে আয়ত্ত করতে পারে। 'হাজার দিনের জানালা'-র সংকট ঠিক এই দৌড়। ভৌত সীমাগুলো সত্যি, কিন্তু সেগুলো এক চলমান লক্ষ্য, যাকে সরিয়ে দিচ্ছে খোদ বুদ্ধিমত্তা।

6. সমাধানবাদের ভ্রান্তি ("UBI-ই সর্বরোগহর")

যুক্তি: "পুরো ভিত্তিটাই মেনে নেওয়া যাক: AI মানুষের সব শ্রম স্বয়ংক্রিয় করে ফেলে। এটা কোনো বিপর্যয় নয়; এটা মানবজাতির প্রাচীনতম স্বপ্নের পূরণ। AI-এর উৎপাদনশীলতার ওপর কর থেকে অর্থায়িত একটি সর্বজনীন মৌলিক আয় (Universal Basic Income) অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করে দেয়। মানুষ শিল্পচর্চা আর আত্মোপলব্ধির পেছনে ছুটতে মুক্ত হবে। 'উদ্দেশ্য-আতঙ্ক' নিয়ে দুশ্চিন্তা এক অভিজাতসুলভ ভাবনা।"

খণ্ডন: এই ইউটোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষা করে ক্ষমতার পদার্থবিদ্যা আর অর্থবহতার মনস্তত্ত্ব। প্রথমত, ক্ষমতার পদার্থবিদ্যা। "বণ্টনের" সমস্যা কোনো সরল কারিগরি চ্যালেঞ্জ নয়; এটা একুশ শতকের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক লড়াই। AI অবকাঠামোর মালিকদের হাতে থাকবে এক অর্থবহ UBI-এর অর্থায়নের জন্য প্রয়োজনীয় করের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নজিরবিহীন ক্ষমতা। সম্ভাব্য ফল মুক্তিদায়ী কোনো লভ্যাংশ নয়, বরং কোনোমতে টিকিয়ে রাখার স্তরের এক শান্ত রাখার হাতিয়ার। দ্বিতীয়ত, অর্থবহতার মনস্তত্ত্ব। ৩০০ বছর ধরে শিল্পসমাজ পরিকল্পিতভাবে অর্থবহতার সমস্ত অ-অর্থনৈতিক উৎসকে ভেঙে দিয়ে তাদের জায়গায় বসিয়েছে একটিমাত্র উৎস: পেশাজীবন। সেই একটিমাত্র স্তম্ভ সরিয়ে নিয়ে কাঠামোটা দাঁড়িয়ে থাকবে, এমন আশা করা যায় না। কর্তৃত্ব আর উদ্দেশ্য হারানো এক জনগোষ্ঠী দার্শনিকদের অভিজাততন্ত্র নয়; সে এক সমাজ, যা প্রভাবিত হওয়ার জন্য পাকা।

7. সমস্থিতির ভ্রান্তি ("ব্যবস্থা খাপ খাইয়ে নেবে")

যুক্তি: "অর্থনীতি এক জটিল অভিযোজী ব্যবস্থা। এমন ব্যবস্থার থাকে শক্তিশালী, স্ব-স্থিতিশীলকারী কৌশল। AI বিপ্লব হবে এক প্রবল ধাক্কা, কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থা নতুন নিয়মকানুন আর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মতো ঋণাত্মক প্রতিক্রিয়া-চক্রের (negative feedback loops) মাধ্যমে তাকে শুষে নেবে, তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে, আর শেষ পর্যন্ত তাকে বশ মানাবে। ব্যবস্থাটা চুরমার হবে না; ধাক্কাটা সামলে নেবে।"

খণ্ডন: এই যুক্তি ব্যর্থ হয়, কারণ সে ধাক্কার প্রকৃতি আর ধাক্কা আসার আগে ব্যবস্থার স্বাস্থ্য দুটোই ভুল বিচার করে। প্রথমত, সমস্থিতি (homeostasis) কাজ করে, যতক্ষণ না আর করে না। শরীরের সমস্থিতি ব্যবস্থা অলৌকিক, যতক্ষণ না আপনি বরফশীতল জলে পড়ে যান। AI তথ্য-অর্থনীতির মাপকাঠির ভেতরের কোনো পরিবর্তন নয়; সে এমন এক শক্তি, যা গোটা ব্যবস্থাকে তার স্থিতিশীল সমস্থিতির পরিসরের অনেক বাইরে ঠেলে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের ব্যবস্থার রোগপ্রতিরোধী সাড়া দুর্বল হয়ে পড়েছে। "ঝড়ের অগ্রদূত" অধ্যায়ে যেমন যুক্তি দেওয়া হয়েছে, আমাদের বৈশ্বিক অর্থনীতি দশকের পর দশক সহনশীলতার বিনিময়ে দক্ষতা কিনেছে। আমরা নতুন ভাইরাসের মুখোমুখি কোনো সুস্থ জীব নই; আমরা এক সুপারবাগের মুখোমুখি রোগপ্রতিরোধে দুর্বল এক রোগী। তৃতীয়ত, এই "আগ্রাসী প্রজাতি" বাস্তুতন্ত্রের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। যে শক্তি সমস্থিতির নিয়মগুলোই নতুন করে লিখতে পারে, তার বিরুদ্ধে সমস্থিতি আত্মরক্ষা করতে পারে না।


রায়:

বিচার শেষ। সংশয়ের জবাব দেওয়া হয়েছে। ভিত টিকে আছে। সাতটি মারাত্মক ভ্রান্তি, যাদের শিকড় ঐতিহাসিক নজিরের গভীর স্বস্তি আর মানুষের যুক্তির প্রতি বিশ্বাসে, শক্তিশালী। এগুলো কথা বলে আমাদের গভীরতম আশার ভাষায়: এবারও আলাদা কিছু নয়, আমাদের হাতে সময় আছে, আমরা বিশেষ, নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে।

কিন্তু আশা পদার্থবিদ্যার বিকল্প নয়।

নির্মাণের অধিকার আমরা অর্জন করেছি। কিন্তু ঘোড়ার গাড়ির নীলনকশা দিয়ে নুহের নৌকা বানানো যায় না। নতুন জগতের স্থাপত্যকে বের করে আনতে হবে আমাদের উন্মোচিত নতুন পদার্থবিদ্যা থেকে। সেই নতুন পদার্থবিদ্যা, বুদ্ধিমত্তার নিয়ম, মূল্যের জ্যামিতি আর শৃঙ্খলার ইঞ্জিনের দিকেই এবার আমাদের ফিরতে হবে, স্বচ্ছ দৃষ্টি আর সংযত মন নিয়ে।

সর্বশেষ হালনাগাদ